নেতাজী ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
(১)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুভাষচন্দ্রকে 'দেশনায়ক' আখ্যা দিয়ে তাসের দেশ নৃত্যনাট্যটি তাঁকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গপত্রে লেখেন: "স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পূণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ ক’রে তোমার নামে ‘তাসের দেশ’ নাটিকা উৎসর্গ করলুম।"
১৯৩৪ এ বর্মার (বর্তমান মায়ানমার) মান্দালয়ের জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় সুভাষ চন্দ্র গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে এক শর্তে মুক্তি দিতে রাজী হন যে, ভারতের কোনো ভূখণ্ড না ছুঁয়ে তিনি যদি বিদেশে কোথাও পাড়ি দেন তবে মুক্তি পাওয়া যাবে। সুভাষ চন্দ্র ইউরোপে যাওয়া মনস্থ করেন ও ভিয়েনা পৌঁছান। দু'বছর চিকিৎসাধীন থাকার সময়ে অবসরে তিনি দুটি বই লেখার সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর আত্মজীবনী 'Indian Pilgrim' এবং 'India's struggle for freedom'।
নেতাজী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, “Vivekananda entered my life”. ত্যাগে বেহিসাবি, কর্মে বিরামহীন, প্রেমে সীমাহীন স্বামীজির জ্ঞান ছিল যেমন গভীর তেমনি বহুমুখী । ………… আমাদের জগতে এরূপ ব্যাক্তিত্ব বিরল । স্বামীজি ছিল পৌরুষসম্পন্ন পূর্ণাঙ্গ মানুষ ……… ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলে গেলেও সেই মহাপুরুষের বিষয় কিছুই বলা হবে না, এমনই ছিলেন তিনি মহৎ, এমনই ছিল তাঁর চরিত্র । যেমন মহান, তেমন জটিল । আজ তিনি জীবিত থাকলে আমি তাঁর চরণেই আশ্রয় নিতাম” ।
ছেলেবেলা থেকে সুভাষ মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছিলেন। পড়াশুনা করার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত ব্যায়াম চর্চা করতেন। বাগানে তরিতরকারি ও ফুল গাছের প্রতি তার খুব ঝোঁক ছিল। প্রত্যহ তিনি বাড়ির মালিদের সাথে গাছে জল দিতেন। তিনি প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হতেন । এই সময় রাভ্যেনশ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাসের সম্পর্কে সুভাষ চন্দ্র তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন যে, “প্রথম দর্শনেই তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তখন আমার বয়স বারোর কিছু বেশি হবে। এর আগে আর কাউকে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধা করেছি বলে মনে পড়ে না। বেণীমাধব দাসকে দেখবার পর শ্রদ্ধা কাকে বলে মনে প্রাণে অনুভব করলাম। কেন যে তাঁকে দেখলে মনে শ্রদ্ধা জাগতো তা বোঝবার মত বয়স তখনো আমার হয়নি। শুধু বুঝতে পারতাম, তিনি সাধারণ শিক্ষকের পর্যায়ে পড়েন না। মনে মনে ভাবতাম, মানুষের মতো মানুষ হতে হলে তাঁর আদর্শেই নিজেকে গড়তে হবে।”
সুভাষ চন্দ্র বসুর বয়স যখন ১৩/১৪ বছর তখন নেতাজী একদিন তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়ীতে বেড়াতে যান এবং তাঁর ঘরে স্বামী বিবেকানন্দের অনেকগুলো বই দেখতে পান। তিনি স্বামীজীর বইগুলো তাঁর কাছ থেকে আনেন এবং পড়েন। এভাবে স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। স্বামীজীর বক্তৃতা ও চিঠিপত্রগুলো তাঁকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করে।
স্বামীজীর বক্তৃতাবলী ও শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ পাঠ করার পর তিনি পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়েন। আধ্যাত্মিক উন্নতি করার জন্য যোগ অভ্যাস শুরু করেন। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে দরিদ্রনারায়ণের সেবায়, রুগ্নের শুশ্রূষায় এবং দুঃস্থের দুঃখ মোচনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করতেন। কি করে স্বামীজীর আদর্শকে তাঁর জীবনে সফল করবেন, সেটাই ছিল তখন নেতাজীর একমাত্র চিন্তা। এই সম্বন্ধে নেতাজী বলছেন, “বিবেকানন্দের আদর্শকে যে সময়ে জীবনে গ্রহণ করলাম তখন আমার বয়স বছর পনেরও হবে কি না সন্দেহ। বিবেকানন্দের প্রভাব আমার জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিল। চেহারায় এবং ব্যক্তিত্বে আমার কাছে বিবেকানন্দ ছিলেন আদর্শ পুরুষ। তাঁর মধ্যে আমার মনের অসংখ্য জিজ্ঞাসার সহজ সমাধান খুঁজে পেয়েছিলাম।”
নেতাজীর ছাত্র জীবনে বিবেকানন্দ কতখানি জুড়ে ছিল সেটি একটা উদাহরণ দিলেই বুঝতে সুবিধা হবে । সাফল্যের সাথে প্রবেশিকা পাশ করার পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে আই.এ ভর্তি হন। এই কলেজে পড়ার সময় তিনি স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ ও ধর্ম চর্চায় আরও বেশী মন দেন। আই.এ. পড়ার একপর্যায়ে মানব সেবার উদ্দেশ্যে তিনি গৃহ ত্যাগ করেন। এসময় তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন তীর্থস্থান ঘুরে বেড়ান। কয়েক মাস পর বাড়িতে ফিরে আসেন। বাড়িতে আসার পর তিনি টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে অনেক দিন ভোগেন। এরপর বাড়ির লোকজন এবং বন্ধুবান্ধব তাঁকে বোঝাতে শুরু করেন আবার পড়াশুনা চালিয়ে যাবার জন্য । সুস্থ হওয়ার পর বার্ষিক পরীক্ষার পূর্বে তিনি পড়াশুনায় মনোযোগ দেন।
তখন পড়াশুনা তার কাছে তুচ্ছ।কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯১৩ সালে নেতাজী প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। সকলে তার রেজাল্ট দেখে অবাক হলেন। ভাল রেজাল্ট করার কারণে তিনি কুড়ি টাকা বৃত্তি পান। এই বৃত্তির টাকা তিনি দীন দুঃখীর সেবায় দান করেন।
এ প্রসঙ্গে একটি গল্প আছে । জানা যায়, প্রবেশিকা পরীক্ষার পর নেতাজী তার মাকে একখানি পত্র লিখেছিলেন। সেই পত্র্রের শেষাংশটি উল্লেখ করছি। – “পড়াশুনা করে যদি কেহ প্রকৃত জ্ঞান না লাভ করিতে পারে- তবে সে শিক্ষাকে আমি ঘৃণা করি। তাহা অপেক্ষা মূর্খ থাকা কি ভাল নয়? চরিত্র গঠনই ছাত্রের প্রধান কর্তব্য- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা চরিত্র গঠনকে সাহায্য করে- আর কার কিরূপ উন্নত চরিত্র তাহা কার্যেই বুঝিতে পারা যায়। কার্যই জ্ঞানের পরিচায়ক। বই পড়া বিদ্যাকে আমি সর্বান্তকরণে ঘৃণা করি। আমি চাই চরিত্র-জ্ঞান-কার্য। এই চরিত্রের ভিতরে সবই যায়- ভগবদ্ভক্তি, স্বদেশপ্রেম, ভগবানের জন্য তীব্র ব্যাকুলতা সবই যায়। বই পড়া বিদ্যাও তুচ্ছ সামান্য জিনিস- কিন্তু হায় কত লোকে তাহা লইয়া কত অহঙ্কার করে।”
(২)
স্টিয়ারিং শক্ত হাতে ধরে বসে আছে চালক। মুখ তার ভাবলেশহীন। অন্তরের শঙ্কা প্রকাশ পাচ্ছে না মুখে, আর সেই পাঠান যুবক? চোখ বুজে সে যেন ধ্যানমগ্ন। কে এই পাঠান? তোমরা এতক্ষনে নিশ্চই অনুমান করে ফেলেছ তার পরিচয়। হ্যাঁ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস। এলগিন রোডের বাড়ি থেকে বৃটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন পাঠান যুবকের ছদ্মবেশে। উদ্দেশ্য ভারতের স্বাধীনতা। একটি বিষয় এখানে লক্ষ্য করার মত, নেতাজীর পিতা ছিলেন প্রথিতযশা ব্যারিস্টার, তাঁর টাকা-পয়সা-সুখ-স্বাচ্ছন্দের অভাব ছিল না। কিন্তু তিনি নিজের স্থিতিশীল অবস্থান (comfort zone) ছেড়ে, নিজের লক্ষ্যে থেকেছেন অবিচল।
সুভাষের মনের মাঝে ভেসে ওঠে স্বামী বিবেকানন্দের ছবি, যাঁর প্রেরণা, বাণী বুকের মাঝে নিয়ে এতদূর এগিয়ে আসা। হে মহাপ্রাণ, শক্তি দাও। এই বিরাট কাজের ভার বইবার শক্তি দাও। নেতাজী সুভাষচন্দ্র স্বামীজী সম্পর্কে বলেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের নিকট আমি যে কত ঋণী তা ভাষায় কী করে প্রকাশ করব? চরিত্র গঠনের জন্য ‘রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ সাহিত্য’ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট সাহিত্য আমি কল্পনাও করতে পারি না।
চুঁচুড়া, ব্যাণ্ডেল, শক্তিগড়, বর্ধমান, আসানসোল, বরাকর ব্রীজ পেরিয়ে গেল গাড়ি। পুব আকাশে আলো ফুটছে। ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে অন্ধকার। আর দেরি নয়। দ্রুত পৌঁছতে হবে গন্তব্যস্থলে। বলা যায় না, পুলিশের চর চারপাশেই ছড়ানো। অবশেষে গাড়ি থামল ধানবাদে একটি বাংলোর সামনে। সে দিনের মত যাত্রার বিরতি। আবার যাত্রা শুরু হবে সূর্যাস্তের পর।
রাত তখন অনেক। এক পাশে উঁচু পাহাড়ের সারি। নীচ দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে রেললাইন। স্টেশন গোমো জংশন। বেশ খানিকটা দূরে অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটা গাড়ি। ভেতরে চার জন যাত্রী। তাঁদের মধ্যে এক জন মহিলা। ঘুমন্ত স্টেশন একসময় জেগে উঠল। ট্রেন আসছে।
গাড়িটা ধীরগতিতে এগিয়ে গেল স্টেশনের দিকে। এ বার সুভাষকে বিদায় নিতে হবে। গাড়ি থেকে নেমে দৃঢ় পদক্ষেপে তিনি এগিয়ে গেলেন প্লাটফর্মের দিকে। বিদায়! সুভাষকে পৌঁছে দিয়ে তিন জন ফিরে এলেন শূন্য মনে। কারা এঁরা? মোটরগাড়িতে করে সুভাষকে নিয়ে এতদূরের পথ পাড়ি দিয়েছিলেন সুভাষেরই ভাইপো শিশির বোস। তিনিই ছিলেন সুভাষের সারথি। আর দুজন ছিলেন শিশির বোসেরই দাদা শ্রী অশোক বোস এবং তাঁর স্ত্রী।
এদিকে ট্রেন ছুটে চলেছে হু হু করে। আর পেছনে তাকানো নয়। এখন শুধুই এগিয়ে চলা। মরণপণ সংগ্রামই এখন জীবনের মূল লক্ষ্য। বিপ্লবের পথ কখনই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। এ পথ চিরকালই ক্ষুরধার। এ পথে যারাই এসেছে, তারাই পদে পদে হয়েছে লাঞ্ছিত, জর্জরিত। সুভাষচন্দ্র বসুও এর ব্যতিক্রম নন। অভাব তো তাঁর ছিল না কিছুরই – অর্থ, যশ, শিক্ষা, দীক্ষা, সম্মান, প্রাচুর্য। তবু সে সব হেলায় ত্যাগ করে তিনি যুদ্ধে নেমেছেন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটিশের সাথে কেবল তাঁর দেশমায়ের মুখের দিকে চেয়ে। অতি কষ্টে তিনি পৌছলেন কাবুলে। ১৯৪১ সাল, ১৭ই মার্চ। বিদায়ের লগ্ন আসন্ন। কিছুদিন পর বার্লিন থেকে ইথার-তরঙ্গে ভেসে এল সেই দৃপ্ত কন্ঠস্বর, ‘আমি সুভাষ বলছি’।
ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি) মূলত গড়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদী নেতা রাসবিহারী বসুর হাতে, ১৯৪৩ সালে রাসবিহারি বসু এই সেনাবাহিনীর দায়িত্ব সুভাষ চন্দ্র বসুকে হস্তান্তর করেণ । একটি আলাদা নারীবাহিনী (রানি লক্ষ্মীবাঈ কমব্যাট) সহ এতে প্রায় ৮৫,০০০ (পঁচাশি হাজার) সৈন্য ছিল। এই বাহিনীর কর্তৃত্ব ছিল প্রাদেশিক সরকারের হাতে, যার নাম দেওয়া হয় "মুক্ত ভারতের প্রাদেশিক সরকার" (আর্জি হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দ)। এই সরকারের নিজস্ব মুদ্রা, আদালত ও আইন ছিল। সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলেছিলো সুভাষের অস্থায়ী সরকার। সেই সরকারকে স্বীকৃতি দিলো জাপান, জার্মানি, ইতালি, ক্রোয়োশিয়া, বার্মা, থাইল্যণ্ড, চিন, ফিলিপাইন, মাঞ্চুরিয়া। রচিত হল জাতীয় সংগীত-
❝ কদম কদম বাড়ায়ে যা
খুশিকে গীত গায়ে যা,
এ জিন্দেগি হ্যায় কৌম কী তু
কৌম পে লুটায়ে যা।❞
সুভাষ চন্দ্র বসু আশা করেছিলেন, ব্রিটিশদের উপর আই.এন.এ.-র হামলার খবর শুনে বিপুল সংখ্যক সৈন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে হতাশ হয়ে আই.এন.এ.-তে যোগ দেবে। কিন্তু এই ব্যাপারটি তেমন ব্যাপকভাবে ঘটল না। বিপরীতদিকে, যুদ্ধে পরিস্থিতির অবনতির সাথে সাথে জাপান তার সৈন্যদের আই.এন.এ. থেকে সরিয়ে নিতে থাকে। একই সময় জাপান থেকে অর্থের সরবরাহ কমে যায়। অবশেষে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মস্বমর্পন এর সাথে সাথে আই.এন.এ. ও আত্মসমর্পন করে। সালটি ছিল এপ্রিল ১৯৪৫। তার প্রায় চার মাস পর ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট। আমাদের জানা নেই সেদিন কি হয়েছিল। সেদিনের পর থেকে নেতাজীকে লোকসম্মুখে আর দেখা যায় নি। তারপর নানা কমিশন, অনুসন্ধান, গবেষনা, লোককথা - নেতাজী সেদিন বিমান দুর্ঘটনার কবলে পরেছিলেন কি না সেকথা আজ কিছুটা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে, কারন তিনি বেঁচে আছেন ও থাকবেন আপামর ভারতবাসীর হৃদয়ে, মননে, চিন্তনে - তাঁর ত্যাগ, সাহসিকতা, দেশমাতৃকার প্রতি অফুরান ভালোবাসার মাধ্যমে। আজ নেতাজী এক প্রবাদ, লোকগাঁথা, দেশপ্রেম ও ভালোবাসার নামান্তর। জয়তু নেতাজী। জয় হিন্দ।

Comments
Post a Comment